‘ডিভাইস আসক্তি’ এবং নতুন প্রজন্মের বাবা-মায়ের দ্বিমুখী পথচলা

Jul 27, 2026 · 7 min read

ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সীমাহীন ব্যবহার বড় থেকে ছোট কাউকে অক্ষত রাখেনি। এ নিয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ চিকিৎসক, কাউন্সিলর থেকে শুরু করে আলেম-উলামা—সবাই নানাভাবে মানুষকে সচেতন করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা এতটাই করুণ যে, তাদের দেওয়া এসব উপদেশও আসক্ত ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘রিলস’ বা ‘শর্টস’-এর মাধ্যমেই দেখছে! কিছুক্ষনের জন্য একটু হালকা অনুশোচনায় ভুগে, সেই ভিডিওটা শেয়ার দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করছে। এই সাধারণ ডিভাইস আসক্তি নিয়ে আমার আগের লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন এখানে

আজকের লেখার বিষয় এমন একদল মানুষকে নিয়ে, যারা এই ব্যাপারে কিছুটা সচেতন। তবে আফসোসের বিষয় হলো, সেই সচেতনতাজনিত ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই’ তাদের আরেকটি বড় ভুলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এরা হলেন সেই বিবাহিত দম্পতিরা, যারা সন্তান লালন-পালন করছেন—যাদের সন্তানের বয়স একদম নবজাতক থেকে শুরু করে টিনএজ পর্যন্ত। অর্থাৎ, যাদের দৈনন্দিন সময়ের একটা সিংহভাগ যায় সন্তানদের দেখভাল ও যত্নে। ২০০০ সালের পর থেকে একটা সমস্যা স্পষ্টভাবে সবার চোখে পড়তে থাকে: নতুন যুগের বাবা-মায়েরা ৯০-এর দশকের বাবা-মাদের মতো সন্তান লালন-পালনে আর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। অথবা ব্যাপারটা এভাবেও বলা যায়—আজকের নতুন বাবা-মায়েরা প্যারেন্টিংকে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও মানসিক চাপের মনে করছেন, এবং এটিকে আর আগের মতো ‘আনন্দদায়ক’ বা ‘রিওয়ার্ডিং’ মনে করতে পারছেন না। ফলে তাদের ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি ও হতাশা। আর সেই হতাশার ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে পড়ছে পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর—বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর ওপর।

এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে, যখন এর সাথে যুক্ত হয় ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট দেখার মাধ্যমে অগণিত সময় অপচয়। এদিকে খেলার মাঠের অভাব এবং ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায়, ছোট ছোট শিশুরাও দিন দিন ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ না থাকায় এই আসক্তি চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো—যে বাবা-মায়েরা নিজেরাই স্ক্রিন-অ্যাডিক্টেড, তারা নিজেদের সন্তানদের এই একই জাল থেকে কীভাবে মুক্ত রাখবেন? ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় পারস্পরিক দোষারোপের এক বিষাক্ত পরিবেশ: “আমার স্বামী বা স্ত্রী সারাদিন মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকে বলেই আজ সন্তানদের ঠিকমতো মানুষ করা যাচ্ছে না!” এর সাথে যখন যুক্ত হয় বাচ্চার মানসিক বিকাশে স্থবিরতা, অতিরিক্ত চঞ্চলতা এবং অবাধ্যতা—তখন বাবা-মায়ের মনে হতে থাকে যেন তাদের পুরো জীবনটাই একটা ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত নাটকের পরও, দিনশেষে মনটা কিন্তু শান্ত হতে চায় না। ওই একই ক্লান্তি আর হতাশা ভুলে থাকার দোহাই দিয়ে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে—মোবাইলের স্ক্রিনে আরেকটু ‘রিলস’ বা ‘শর্টস’ দেখার জন্য!

আজকের এই লেখায় আমি চেষ্টা করব দম্পতিদের এই হতাশা, তিক্ততা এবং একে অপরকে দোষারোপ করার চক্র থেকে বের হয়ে আসার পথগুলো নিয়ে কথা বলতে। একইসাথে সন্তান লালন-পালনের কিছু মৌলিক নীতি আলোচনা করব, যাতে আমরা আমাদের মূল উদ্দেশ্য (দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ) থেকে দূরে সরে না যাই।

১. ‘প্যাসিভ কনটেন্ট’ দেখা কখনো ক্লান্তি দূর করে না

অনেকে মনে করেন, “আমি তো ডিভাইস আসক্ত নই! সারাদিনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ আর অবসাদ থেকে একটু রিফ্রেশ হতে রিলস বা শর্টস দেখে নিজেকে একটু ‘ট্রিট’ দিই।” এটি বহু মানুষের কাছে একটি শক্ত অজুহাত। কিন্তু মনে রাখবেন, Passive Content Consumption কখনো আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্লান্তি দূর করতে পারে না। বরং এটি আপনার মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী ডোপামিন রিলিজ করে আপনাকে এর উপর আরও বেশি নির্ভরশীল ও আসক্ত করে তোলে। সোজা কথায়, আজ ভালো বোধ করার জন্য যদি আপনি ৩০ মিনিট ভিডিও দেখেন, কিছুদিন পর ১ ঘণ্টাতেও সেই তৃপ্তি আসবে না। তাই প্রথম কাজ হলো—নিষ্ক্রিয় ভিডিও দেখা ও শেয়ার করার অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসা। এই খালি সময়টুকু বই পড়া, জীবনসঙ্গীর সাথে সরাসরি গল্প করা, কিংবা দূরবর্তী স্বজন বা বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বলে পূরণ করা যেতে পারে। এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, দিনশেষে নিজের ভালো লাগা বা মানসিক প্রশান্তিকে যখন কেবল মোবাইলের স্ক্রিনের সাথে বেঁধে ফেলবেন, তখন মোবাইল ছাড়া আপনার আর কিছুই ভালো লাগবে না। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই যদি আপনার স্বামী বা স্ত্রী আপনাকে অন্য কোনো পারিবারিক কাজ করতে বলেন, আপনি চরম বিরক্ত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। আর তার পরের পাল্টাপাল্টি ঝগড়ার গল্প তো আমাদের সবারই জানা!

২. অবাধ্যতা সামলাতে সীমানা (Boundary) নির্ধারণ ও ঠান্ডা মাথার কর্তৃত্ব (Authority)

এবার আসা যাক চঞ্চল ও অবাধ্য সন্তানদের সামলানোর বিষয়ে। এই নিয়মটি যেকোনো বয়সের বাচ্চার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা সম্ভব। বিষয়টি হলো—কোনো কাজের আদেশ বা নিষেধের জন্য শুরুতেই একটি স্পষ্ট সীমানা বা Boundary নির্ধারণ করা, এবং তা খুব শান্ত, মেজাজ না হারিয়ে, কিন্তু দৃঢ় গলায় সন্তানকে জানিয়ে দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ—কোনো শিশু যদি কোনো মুরুব্বির কোলে উঠলেই গায়ে হাত তোলে বা টয়লেটে গিয়ে খেলার ছলে নোংরা করে, তাকে রাগ না দেখিয়ে স্বাভাবিক গলায় স্পষ্ট করে বলুন: “তুমি এটা করবেনা, যদি করো, তবে আজকের জন্য তোমার প্রিয় এই খেলনাটি রেখে দেওয়া হবে (অথবা তোমার বিকেলের খেলার সময় বন্ধ থাকবে)।” বাচ্চা যখন সীমানা অতিক্রম করবে, তখন তাকে সেই ফলাফলের মুখোমুখি হতেই হবে। এই সময়ে শিশু যতই চিৎকার করুক, কান্নাকাটি করুক বা দরকষাকষি করার চেষ্টা করুক—বাবা-মাকে একদম বিচলিত হওয়া চলবে না। শিশু যতই ‘ট্যানট্রাম’ (Tantrum) বা অহেতুক বায়না দেখাক না কেন, আপনাকে ঠান্ডা মাথায় তা সহ্য করতে হবে। কোনোভাবেই ওর চিৎকার-চেঁচামেচিতে রিয়্যাক্ট করা যাবে না। বাচ্চা কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝে যাবে যে, চিৎকার বা বায়না ধরে আপনার সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব নয়।

কিন্তু নতুন বাবা-মায়েরা যে ভুলটি বারবার করেন তা হলো—বাচ্চার বায়নার সময় নিজেরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। তারা বাচ্চার সাথে তর্কে জড়িয়ে যান, সীমানার কথা বলে ধমকাতে থাকেন, এমনকি গায়ে হাতও তোলেন। একপর্যায়ে শিশুটি হয়তো সাময়িকভাবে শান্ত হয়, কিন্তু সে একটা ভুল বার্তা পায়। সে শেখে যে, প্রথমবার বাবা-মায়ের কথা মানার দরকার নেই, মার খাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মানলেই চলবে! তাই বাচ্চার ট্যানট্রামের সময় তাদের সাথে তর্ক বা গায়ে হাত না দিয়ে, কেবল শান্ত থেকে তাদের ভুল আচরণটি ঠেকানোই যথেষ্ট।

৩. ফলাফলের দুশ্চিন্তা ছেড়ে পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া

আমাদের আরেকটি বড় মানসিক ভুল হলো—পদ্ধতি ঠিক না রেখে কেবল ভবিষ্যতের ‘ফলাফল’ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা। “আমার সন্তান বড় হয়ে কেমন হবে? সে কি ঠিকমতো মানুষ হবে?"—এই ভয় ও দুশ্চিন্তা সন্তানদের সামনে আমাদের দুর্বল ও অস্থির হিসেবে উপস্থাপন করে। শিশুরা অত্যন্ত সংবেদনশীল; তারা বাবা-মায়ের ভেতরের এই ভয় ও মানসিক দুর্বলতা খুব দ্রুত আঁচ করতে পারে। আর তখন তারা এই দুর্বলতাকে হাতিয়ার বানিয়ে নানা অহেতুক দাবি আদায় করতে শুরু করে। প্যারেন্টিংয়ে আমাদের দায়িত্ব সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করা, ফলাফলের অভিভাবক আমরা নই। আমরা যদি সঠিক নিয়মে ধৈর্য ও ভালোবাসার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাই, তবে ফলাফলের জন্য মহান আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।

৪. শারীরিক ও মানসিক স্ট্যামিনা তৈরি করা

সন্তান লালন-পালনে শারীরিক ও মানসিক শক্তি (Stamina) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। আগের প্রজন্মের বাবা-মায়ের সাথে বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় তফাত হলো কায়িক শ্রমের অভাব। কায়িক পরিশ্রম না থাকা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে আমরা অধিকাংশই কম-বেশি স্থূলতা বা শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছি। তার ওপর যোগ হয়েছে রিলস আর শর্টস দেখে দেখে আমাদের মনোযোগের পরিধি (Attention Span) এবং মানসিক সহনশীলতা কমে যাওয়ার করুণ দশা! আজকাল প্রায়ই নতুন বাবা-মাকে বলতে শোনা যায়, “একটা বাচ্চা সামলাতেই জীবন শেষ! আগের দিনের মানুষ যে কীভাবে ৫-৬টা সন্তান বড় করত, আল্লাহই ভালো জানেন!” এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটাই পথ—যেই সময়টা নিজেকে ‘ট্রিট’ দেওয়ার নামে রিলস ও শর্টস দেখে নষ্ট করছেন, সেই সময়টাকে উদ্ধার করুন। নিজের শরীরের যত্ন নিন। প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট হাঁটুন, হালকা ব্যায়াম বা ওয়েট ট্রেনিং করুন। যখন আপনার শরীর সতেজ থাকবে, তখন মনও প্রফুল্ল থাকবে। আর সন্তান সামলানোর জন্য যে বিপুল ধৈর্য ও শারীরিক শক্তির প্রয়োজন, তা আপনি সহজেই ফিরে পাবেন। শুরুতেই এই নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে মন কিছুটা বাধা দেবে, কিন্তু নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই অলসতাকে জয় করতেই হবে।

৫. গোছানো জীবন ও মানসিক প্রশান্তি

আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কিছুটা সুশৃঙ্খল করা প্রয়োজন। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে পরের দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি তালিকা তৈরি করুন এবং সেগুলোর অগ্রাধিকার (Priority) ঠিক করে নিন। যে বিষয়গুলোর ওপর আপনার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সে বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করা বন্ধ করুন। তকদির বা ভাগ্যের ওপর সঠিক জ্ঞান অর্জন করে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরঞ্জিত ভয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। নিজের সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই হলো মানসিক শান্তির আসল চাবিকাঠি।

পরিশেষে

দিনশেষে একটি বিষয় আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে—সন্তান কোনো বোঝা নয়, বরং সন্তান হলো মহান আল্লাহর দেওয়া একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমানত ও নিয়ামত। কিন্তু আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়, কনজুমারিজম এবং সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের তৈরি ভার্চুয়াল কৃত্রিমতা আমাদের এই সত্যকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যা আমাদের সার্বক্ষণিক অস্থির ও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে, আর সেই অস্থিরতার প্রথম শিকার হচ্ছে আমাদের কোমলমতি সন্তানেরা। একজন সচেতন বাবা-মা হিসেবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, সন্তান আমাদের কেবল মুখের কথা দেখে শেখে না; বরং তারা শেখে আমাদের আচরণ দেখে। আমরা যদি সারাদিন হাতে মোবাইল নিয়ে বসে থেকে তাদেরকে বই পড়তে বলি, কিংবা নিজেরা প্রতিনিয়ত অস্থিরতা প্রকাশ করে তাদের শান্ত হতে বলি—তবে সেই উপদেশ কখনো কাজ করবে না।

আসুন, সাময়িক ডোপামিন আর ভার্চুয়াল জগতের সস্তা বিনোদন ছেড়ে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতে মনোযোগ দিই। জীবনসঙ্গীর হাত ধরুন, সন্তানের সাথে মুখোমুখি বসে গল্প করুন, তাকে ভালোবাসার স্পর্শ দিন। প্যারেন্টিং কোনো নিখুঁত হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, এটি পরম ধৈর্যের একটি দীর্ঘ সফর। আল্লাহ আমাদের সন্তানদের জন্য একটি ইতিবাচক ও আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন, এবং আমাদের পরিবারগুলোকে দুনিয়া ও আখেরাতে মানসিক প্রশান্তি ও সাফল্যের মাধ্যম বানিয়ে দিন।

আবু আঈশা
১৩ সফর ১৪৪৮

Back to top