নিউট্রিশন নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তি এবং নিজেদের বানানো কিছু ‘মিথ’

May 31, 2026 · 6 min read

মাসখানেক আগে ২২ থেকে ২৩ বছর বয়সী পূর্বপরিচিত এক ছেলে মেন্টাল সাপোর্টের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করে। এই অল্প বয়সেই তার ফ্যাটি লিভার এবং হাই ব্লাড প্রেসার ধরা পড়েছে, যা নিয়ে সে ভীষণ ভয়ে আছে। অথচ এই শতকের শুরুতেও আমরা ৪০ বছর বয়সী কারো ডায়াবেটিস অথবা হাই ব্লাড প্রেসার হলেও সেই খবর শুনে আঁতকে উঠতাম। আর গত ১০ বছর ধরে আমরা ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে আমাদের আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার বা ফ্যাটি লিভারের মতো রোগগুলো হবেই এটাকেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু এখন ভয়ের ব্যাপার হলো, এই বয়সটা আরও কমে এসে ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে নেমে এসেছে। এটি এক ভয়াবহ মহামারীর পূর্বাভাস অথবা আমরা হয়তো সেই মহামারীতে পৌঁছে গেছি।

অথচ ভুক্তভোগী রোগীদের জিজ্ঞেস করলে দেখবেন, তারা খুব স্বাভাবিকভাবে তকদিরকে দোষ দিচ্ছে। তাদের ধারণা—তারা অস্বাস্থ্যকর বা ক্ষতিকর কিছুই খায় না! এই অবাস্তব optimism আমাদের সমাজের অনেকের মধ্যেই আছে। সম্ভবত এই কারণেই আমরা এমন গল্পও শুনি যে—কিডনি রোগীকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়ে হোস্ট জোর করে তার জন্য ক্ষতিকর খাবার পাতে তুলে দিচ্ছে আর বলছে, “আরে ভাই, একদিন খেলে কিছু হয় না!” একইভাবে ডায়াবেটিক রোগীকে অনুরোধের নামে সফট ড্রিঙ্কস আর একের পর এক মিষ্টি গেলানো তো আমাদের সমাজের প্রতিদিনের চিত্র।

আমাদের অঞ্চলের মানুষের (শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবারই) নিউট্রিশন বা পুষ্টি বিষয়ক জ্ঞান খুবই কম, এবং এই বিষয়ে জানার কোনো আগ্রহ বা ইচ্ছাও নেই। সম্ভবত তাদের অনিচ্ছার মূল কারণ হলো—সঠিক নিউট্রিশন জ্ঞান থাকলে তা তাদের এই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের জন্য একটা মানসিক বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আর এই লাইফস্টাইল যেন চালিয়ে নেওয়া যায়, সেজন্য আমরা নিজেরা কিছু ‘মিথ’ বা ভুল ধারণা বানিয়ে নিয়েছি, যেগুলো সুযোগ বুঝে আমরা জাস্টিফিকেশন হিসেবে ব্যবহার করি। এর ফলেই এখন ২০-২২ বছরের ছেলে-মেয়েদের ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিনেজ বাচ্চাদের মোটা হয়ে যাওয়াটা এখন চোখে পড়ার মতো। সেখানেও বাবা-মায়েরা কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে এক ধরনের সান্ত্বনা খোঁজেন যে—“বড় হলে এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।” অথচ এক সময় এই ওজন আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসে না।

আজকের লেখায় আমাদের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসকে জায়েজ করার জন্য ব্যবহৃত এমন কিছু প্রচলিত ও ভুল ধারণা নিয়ে কথা বলব:

১. “আমি তো তেমন কিছুই খাই না!” সকালে একগাদা তেল দিয়ে পরোটা ও ডিম ভাজি (সাথে কখনো আলু ভাজিও), বেলা ১১টার সময় সিঙ্গারা বা সমুচার স্ন্যাক্স, দুপুরে ভরপেট ভাত, বিকেলে আবার চায়ের সাথে নাস্তা এবং রাতে ভারী খাবার—এসব খাওয়ার পরও অনেকে দাবি করেন, “আমি তো তেমন কিছুই খাই না!” এর প্রধান কারণ নিউট্রিশনের সঠিক আইডিয়া না থাকা। আমরা যে ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া অলস জীবনযাপন করি, তাতে এই চার বেলা খাবারের কোনো প্রয়োজনই নেই। আমরা আসলে ক্ষুধার কারণে খাই না, অভ্যাসবশত দিনে ৪-৫ বার খেতে থাকি এবং সেই অতিরিক্ত ক্যালোরি, ফ্যাট হিসেবে শরীরে জমতে থাকে। এছাড়া প্রতিবেলার এই ভাজাপোড়া খাবারের মাধ্যমে যে কী পরিমাণ এক্সট্রা ক্যালোরি শরীরে ঢুকছে, সে ব্যাপারে আমরা বেশির ভাগ মানুষই পুরোপুরি গাফেল!

২. “বাসায় বানানো খাবার তো, এতে ক্ষতি হবে না!” বেকারি আইটেম, ডুবো তেলে ভাজা খাবার কিংবা অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার যদি বাসায় বানানো হয় বা গরম-গরম পরিবেশন করা হয়, তবে আমরা ধরে নিই এটি খুব স্বাস্থ্যকর। বছর খানেক আগে ঈদের পর আমার বাবার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তিনি আমার সামনে সাত রকমের মিষ্টি আইটেম দিলেন। তাঁর মারাত্মক ডায়াবেটিসের কথা আমার জানা ছিল। আমি নিজে কিছুটা খেলেও জানালাম যে, আমার পক্ষে এই সাতটি আইটেমের প্রতিটি খাওয়া সম্ভব নয়। তখন তিনি বললেন, “আরে এগুলো তো গরম গরম বাসায় বানানো; এগুলোতে ডায়াবেটিস বাড়বে না!” এমন চিন্তা থেকেই আমরা ঘরে তৈরি ফ্রোজেন ফুডকেও (যা শেষ পর্যন্ত ডুবো তেলেই ভাজতে হয়) স্বাস্থ্যকর মনে করি।

আদতে ভাজাপোড়া, বেকারি বা অতিরিক্ত ডেইরি প্রোডাক্ট আমাদের শরীরে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি প্রবেশ করায়। এগুলোর ‘Satiety Index’ (একটি খাবার আপনার ক্ষুধা কতটুকু মেটাতে পারে এবং কতক্ষণ পেট ভরা রাখার অনুভূতি দিতে পারে তার পরিমাপ) থাকে অত্যন্ত কম। ফলে অনেক বেশি ক্যালোরি খাওয়ার পরও কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ক্ষুধা লেগে যায়, ফলে আমরা আবার খাই। দোকানের পোড়া তেল শরীরের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয় সত্য, তবে বাসায় বানানো হলেও হরেকরকম ভাজাপোড়া ও মিষ্টি জাতীয় খাবার ঠিক একই রকমভাবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, যেমনটা বাইরের দোকানের গুলো।

৩. “ডায়েট কন্ট্রোল তো শুধু বাসার জন্য!” আমি নিজে দেখেছি এবং অনেক ডাক্তারের কাছ থেকেও শুনেছি যে, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বেলায় রোগীরা মনে করেন নিয়মকানুন কেবল ঘরের ভেতরেই মানতে হয়। যেমন, একবার এক ডাক্তার রোগীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাকে সফট ড্রিঙ্কস খেতে নিষেধ করেছিলাম, সেটা কি মেনে চলছেন?” উত্তরে রোগী বললেন, “কবে শেষ বাসায় সফট ড্রিঙ্কস কেনা হয়েছে, সেটাই তো মনে নেই ডাক্তার সাহেব!” ডাক্তার সাহেব অবাক হয়ে বললেন, “তাহলে আপনি সফট ড্রিঙ্কস খাচ্ছেন না?” উত্তর এলো, “না, মানে দাওয়াতে গেলে বা বাইরে কেউ অফার করলে তো আর না করা যায় না।” ডাক্তার সাহেব যখন জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে গত সপ্তাহে মোট কতবার খেয়েছেন?” তখন রোগী অস্বস্তির হাসি হেসে বললেন, “এই ৪-৫ বার হবে।” ঘরের বাইরে খেলেই নিয়মের বাইরে কিছু খাওয়া বা বিধি-নিষেধ ভাঙা হচ্ছে না—এমন একটি অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দিই।

৪. “আদরের নামে বাচ্চাদের ওবেস (Obese) বানিয়ে ফেলা” আমাদের সমাজে শিশু-কিশোরদের ভালোবেসে অতিরিক্ত খাইয়ে মোটা বা ওবেস (obese) বানিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দাদা-দাদি এবং নানা-নানিরা অনেক সময় বেশি ভূমিকা পালন করেন। বাচ্চা দেখতে মোটাসোটা না হলে তাঁরা উল্টো বাচ্চার বাবা-মাকে দোষ দেন যে সন্তানকে ঠিকমতো খেতে দেওয়া হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বাইরের প্রসেসড ফুড বা দোকানের খাবার খাইয়ে বাচ্চার ওজন বাড়ানোতে উনারা ভূমিকা রাখেন। এই স্থূলতা যখন টিনএজ বয়সে পৌঁছায়, তখন তা কমানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এক সময় বাচ্চার বডি স্ট্রাকচার স্থায়ীভাবে এমন হয়ে যায় যে, সেখান থেকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা যায় না।

৫. “ব্যায়াম করছি, তাই এখন বেশি খাওয়া যাবে!” এই ধারণাটি আমাদের অনেকের মধ্যেই রয়েছে এবং এটি জানা খুবই জরুরি। আমরা যখন সামান্য শরীরচর্চা বা হাঁটা শুরু করি, তখন আমাদের মনে হয় যে আমরা যতটুকু ক্যালোরি আসলে বার্ন করেছি, তার চেয়ে চারগুণ বেশি বার্ন করে ফেলেছি! এই ভেবে আমরা আগের চেয়েও খাওয়ার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিই। ফলে ওজন কমার বদলে উল্টো বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে আমরা হতাশ হয়ে ঘোষণা করি, “এসব ব্যায়াম-শরীরচর্চা আসলে স্ক্যাম, এগুলোতে কোনো লাভ হয় না; আমি যেভাবে চলছিলাম সেভাবেই চলব।” এছাড়া শহরাঞ্চলে পার্কগুলোতে আমরা প্রায়ই দেখি বয়স্ক ব্যক্তিরা অল্প কিছু হেঁটেই দল বেঁধে রেস্তোরাঁয় বসে ভূরিভোজ করে বাসায় ফিরেন এবং ডাক্তারের কাছে ফলো-আপ করতে গিয়ে সেই পুরোনো অজুহাত দেন, “আমি তো খুব হাঁটছি, সব বিধি-নিষেধ মেনে চলছি; কিন্তু কেন যে সুগার নিয়ন্ত্রণে আসছে না?”

তাই আমাদের বুঝতে হবে যে, সুস্থ ওজনের মূল ফর্মুলা হলো—অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষুধা ছাড়া খাওয়া বন্ধ করা। ব্যায়াম আপনাকে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ পার্সেন্ট সাপোর্ট দিতে পারে, বাকি ৮০ পার্সেন্ট নির্ভর করে আপনার খাদ্যাভ্যাসের ওপর। সীরাহ বা ইসলামের ইতিহাস ঘাটলে আপনি দেখতে পাবেন, মুসলিমরা যতদিন পর্যন্ত খাবারের দিক থেকে সংযমী ও মিতব্যয়ী ছিল, ততদিন তারা পৃথিবীতে শাসন করেছে। যখনই ধন-দৌলত ও বিলাসী খাবার বাড়ল, তখনই সমাজ জুড়ে স্থূলতা জেঁকে বসলো। আর এর প্রমাণ রয়েছে আল্লাহর রাসুল (সা:)-এর সেই বিখ্যাত হাদিসে, যার এই শেষ অংশটুকু আমরা সচরাচর খুব একটা আলোচনা করতে শুনি না:

‘ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, আমার যুগের লোকেরাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। অতঃপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা, অতঃপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা। ‘ইমরান (রাঃ) বলেন, আমি বলতে পারছি না, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (তাঁর যুগের) পরে দুই যুগের কথা বলেছিলেন, বা তিন যুগের কথা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমাদের পর এমন লোকেরা আসবে, যারা খিয়ানত করবে, আমানত রক্ষা করবে না। সাক্ষ্য দিতে না ডাকলেও তারা সাক্ষ্য দিবে। তারা মান্নত করবে কিন্তু তা পূর্ণ করবে না। তাদের মধ্যে মেদওয়ালাদের প্রকাশ ঘটবে।

(বুখারী ২৬৫১)

Back to top