স্মিত হাসির আড়ালে লুকানো নেশা: আপনিও কি আপনার সন্তানের মতো আসক্ত
স্ক্রিন অ্যাডিকশনের কারণে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকলাঙ্গতা পর্যন্ত ঘটতে পারে—এ কথা আমরা এখন সবাই জানি। মজার ব্যাপার হলো, আমরা বড়রাও এই কুপ্রভাব সম্পর্কে অবহিত হয়েছি ওই স্ক্রিনেই বিভিন্ন ভিডিও দেখে। কিন্তু আমাদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা চেইন-স্মোকারদের মতো। প্যাকেটের গায়ে ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ পড়েও তারা যেমন বছরের পর বছর টেনে যান, আমরাও স্ক্রিন অ্যাডিকশনের কুফল জেনেও সন্তানদের রক্ষা করার কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নিই না। এর মূল কারণ—আমরা নিজেরাও একই নেশায় আক্রান্ত। মা-বাবা বা অভিভাবক হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা নিজেরা যে স্ক্রিন অ্যাডিকশনে ভুগছি—এই সত্যটা আমরা স্বীকারই করতে চাই না। অথচ যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপই হলো সেটি মেনে নেওয়া। চলুন, শিশুদের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বুঝে নিই এবং এরপর সেটি নিজেদের ওপর প্রয়োগ করি।
বাস স্টপেজ, রেল স্টেশন, এয়ারপোর্ট বা ডাক্তারের চেম্বারে গেলেই স্ক্রিন-আসক্ত শিশুদের দেখা মেলে। সাধারণত এসব জায়গায় মানুষ অপেক্ষা করে আর সেখানেই দৃশ্যটা খুব প্রকট হয়। দৃশ্যটা খুব কমন: শিশুটি বাবা বা মায়ের দেওয়া ফোনে ‘রিলস’ দেখছে কিংবা ‘কোকোমেলন’-এর মতো মস্তিষ্ক বিকলকারী কনটেন্ট গিলছে। যেই না মা বা বাবা ফোন আসার কারণে মোবাইলটা হাত থেকে নিয়ে নেন, অমনি শিশুটি তারস্বরে চিৎকার শুরু করে আর মাটিতে শুয়ে হাত-পা ছুড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে অভিভাবকরা দ্রুত ফোনটি ফেরত দেন এবং অপেক্ষমাণ রুমে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনেন। অদ্ভুত বিষয় হলো, ফোন হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই কান্না উধাও, মুখে সেই স্মিত হাসি ফিরে আসে। সে আবার দুনিয়া ভুলে স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে পড়ে। দৃশ্যটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছে না? আসলেই তাই। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি, আমরা বড়রাও ঠিক একই আচরণ করি। সারাদিনের কাজ শেষে মা অথবা অফিস শেষে বাবা যখন ভাবেন একটু ‘রিলস’ বা ‘শর্টস’ দেখে নিজেকে একটু ‘ট্রিট’ দেবেন—তখন আমাদের অজুহাতও রেডি থাকে। কেউ রান্না শিখছি, কেউ শপিং দেখছি, কেউবা পলিটিক্যাল আপডেট নিচ্ছি। খেয়াল করে দেখবেন, ওই সময় আমাদের চেহারায়ও সেই নেশাতুর শিশুর মতো একটা স্মিত হাসি থাকে। বিজ্ঞাপন, হাসির রিলস বা পলিটিক্যাল স্যাটায়ারের আড়ালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় চলে যায়।
বিপত্তি বাধে তখনই, যখন আমাদের সন্তানরা এসে কিছু শেয়ার করতে চায়, স্কুলের কোনো গল্প বলতে চায়, অথবা ঘরের অন্য সদস্যরা কোনো বিষয়ে সাহায্য চায়। ঠিক তখনি আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় বিরক্তি। আমরা চেঁচিয়ে বলি, “কী চাই? বিরক্ত করো কেন?” যেন সব শান্তি আর প্রশান্তি ওই পাঁচ-ছয় ইঞ্চির স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ। এমনকি কেউ এসে বিরক্ত না করলেও ঘণ্টাখানেক স্ক্রিন স্ক্রল করার পর যখন আমরা অন্য কাজের জন্য উঠতে যাই, তখন এক ধরনের বিষণ্ণতা কাজ করে। এখানেই স্ক্রিন অ্যাডিকশন একজন মানুষকে পুরোদস্তুর মাদকাসক্তের মতো আচরণ করতে বাধ্য করে। নেশার প্রভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেমন সুখানুভূতি পায় এবং নেশার প্রভাব কাটলেই অস্থির হয়ে ওঠে, আমরাও তাই করছি। ফলে পরিবার আমাদের কাছ থেকে যে কোয়ালিটি সময় ও মনোযোগ পাওয়ার কথা ছিল, তা তারা পাচ্ছে না। যদি মোবাইল স্ক্রিন থেকে চোখ সরালেই আপনার বিষণ্ণ লাগে কিংবা ব্যবহারের সময় কেউ কথা বললে মেজাজ বিগড়ে যায়—তবে বুঝে নিন আপনিও আসক্ত। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার জন্য ইচ্ছাশক্তি জরুরি, তবে একজন মুসলিম হিসেবে এই শক্তির আগে আমাদের আল্লাহর ভয় ও সাহায্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে। আমরা স্ক্রিন অ্যাডিকশনের কারণে যেসব পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব অবহেলা করছি, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের ওপর ‘ওয়াজিব’ বা আবশ্যক দায়িত্ব। এই অবহেলায় যে কেবল দুনিয়া নয়, আখিরাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এই চিন্তাটাই আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে মজবুত করবে। এছাড়া নিচের পদক্ষেপগুলো ফলপ্রসূ হতে পারে:
সুনির্দিষ্ট কনটেন্ট: ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশের আগেই স্থির করুন আপনি ঠিক কী দেখবেন। কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে অন্য কোনো লিংকে না গিয়ে বেরিয়ে আসুন।
অগোচরে স্ক্রিন টাইম: আপনার যদি একান্তই স্ক্রিন টাইমের প্রয়োজন হয়, তবে সেটি সন্তানদের অগোচরে সারুন। যেমন—বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ার পর ১৫-৩০ মিনিট সময় দিন।
ল্যাপটপ বনাম মোবাইল: প্রয়োজনীয় লেখালেখি বা গবেষণার কাজ ল্যাপটপে করা ভালো। মোবাইলে কাজ করলে আপনার আশপাশের মানুষের কাছে মেসেজ যায় যে আপনি স্রেফ ব্রাউজ করছেন। ফলে আপনি যখন অন্যদের উপদেশ দেবেন, তারা সেটি গুরুত্ব দেবে না।
বিকল্প বিনোদন: নিজেকে ব্যস্ততা শেষে রিফ্রেশমেন্ট দিতে চাইলে ভালো সাহিত্য পড়ুন। শিকার কাহিনী, গোয়েন্দা গল্প, ভ্রমণ কাহিনী কিংবা কোনো উপন্যাস—‘রিলস’ বা ‘শর্টস’ নয়। পারিবারিক আড্ডা: ডিনারের পর নিয়মিত আড্ডা চালু করুন যেখানে বড়রা নিজেদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণ করবে। মোবাইল ছাড়া পৃথিবী কেমন ছিল, সেই গল্প শোনাবেন। এতে সন্তানদের সাথে আপনার বন্ডিং মজবুত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাউন্সেলিং করতে গিয়ে আমি স্ক্রিন অ্যাডিকশন নিয়ে প্রচুর পারিবারিক অশান্তির ঘটনা পাচ্ছি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যিনি অন্যের নামে অভিযোগ করছেন, তিনিও একইভাবে আসক্ত। কিন্তু আমরা অন্যের আসক্তি সহ্য করতে পারি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা উপদেশ শেয়ার করি ঝড়ের গতিতে, কিন্তু নিজে সেটা মানার তাগিদ পাই না। তাই এই নসিহতটি আগে নিজের ওপর প্রয়োগ করুন, নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনুন। এরপর কোনো সুন্দর মুহূর্তে বিনয়ের সাথে জীবনসঙ্গীর সাথে আলাপ করুন। আল্লাহ আমাদের সময়কে হেফাজত করুন এবং পরিবারগুলোকে সুখের নীড় বানিয়ে দিন।
আবু আঈশা ৪ শাওয়াল ১৪৪৭