ফিরে দেখা : একটি বিষণ্ণ স্মৃতি এবং কিছু নাসীহাহ
২০০০-২০০১ সালের কথা বলছি; আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগের কথা। HSC পরীক্ষার পর ডাক্তার হবার জন্য মেডিক্যালে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কিন্তু সেবার নতুন পাঠ্যপুস্তক আসার কারণে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা কখন হবে সেটা ২০০০ সালের শেষার্ধেও বেশ অনিশ্চিত ছিল। এর মধ্যে যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়ে যাচ্ছিল, তাই মেডিক্যালের চিন্তা বাদ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়েই মনোযোগ দিলাম এবং সুযোগও পেয়ে গেলাম (আল্লাহর সাহায্যেই বলতে হবে)।
চট্টগ্রাম থেকে কোচিং করে তখন ঢাকার কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া বেশ বিরল ছিল; তাই সুযোগ পাওয়ার পর চট্টগ্রামের কোচিং সেন্টারগুলোতে আমার খুব কদর বেড়ে গেল। সেশনজটের কারণে আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১০ মাস পর, অর্থাৎ ২০০১ এর দ্বিতীয় ভাগে। সেই সময় আমি টিউশনি করে এবং কোচিং সেন্টারের খাতা দেখে মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি রোজগার করছিলাম—বাবা-মা সহ পরিবারের অন্যদের কথায় কথায় উপহার দিচ্ছি—সব মিলিয়ে বেশ রমরমা অবস্থা। কিন্তু এর মধ্যেও একজন খুব বিষণ্ণ ছিলেন; তিনি হলেন আমার মা (রাহিমাহাল্লাহ), (আমি আম্মা বলে ডাকতাম)। আমি তাঁর চার সন্তানের সব চেয়ে ছোট এবং ‘মা-নেওটা’ ছেলে বলতে যা বোঝায়, আমি ছিলাম একেবারে তাই।
আমাদের বড় বোন ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন, তাই মেজো বোনই ছিলেন সবার বড়। তাঁর তখন বিয়ে হয়ে গেছে, আর বড় ভাই ছিলেন বেশ বন্ধু-ঘেঁষা, বাসায় কদাচিৎ থাকতেন। আম্মার সারাদিনের সেই একা জীবনে (যখন আব্বা অফিসে থাকতেন আর ভাইয়া ভার্সিটিতে) আমিই ছিলাম তাঁর একনিষ্ঠ সঙ্গী। কোথাও বাইরে যেতে বললেই আমি সাথে চলে যেতাম, কখনো না করতাম না। অলস দুপুরগুলোতে আম্মা আমাকে হাঁস-মুরগি দেখাশোনা করার (আমরা শহরে থাকলেও বাসার চারপাশে গাছ লাগানোর এবং হাঁস-মুরগি পালনের বেশ জায়গা ছিল) আর কেউ এলে সদর দরজা খুলে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। আমি অনেক পরে বুঝতে পেরেছিলাম, আমার এই নতুন ব্যস্ততা আর এক বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমানোর আগাম আভাস পেয়েই আম্মা হয়তো বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু কেবল বিষণ্ণতায় তাঁর প্রান্তিক অসুস্থতার শুরু ছিল না।
আম্মার ডায়াবেটিস নিয়ে আমাদের পরিবারের সবার যে অজ্ঞতা আর উদাসীনতা ছিল, তা মনে পড়লে আজো আমি বিব্রত হই নিজের কাছে। অনেক বছর পর একজন ডাক্তারের কাছ থেকে জেনেছিলাম যে, একজন ডায়াবেটিস রোগী যদি খারাপ বোধ করেন, তবে প্রথমেই দেখতে হবে তাঁর সুগার লেভেল এলোমেলোভাবে ওঠানামা করছে কি না। আমাদের চোখের সামনেই আমরা (আমি আর ভাইয়া, যেহেতু আপার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আর আব্বা অফিসে থাকতেন) দেখতাম আম্মা অসুস্থ বোধ করছেন, আচরণে অসামঞ্জস্যতা দেখাচ্ছেন (যেমন ছোট্ট শিশুদের মতো আচরণ করা) অথবা বিষণ্ণ হয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে আছেন। কিন্তু আমাদের কখনোই মনে হয়নি যে তিনি নিয়মিত ওষুধ না খেয়ে ফেলে দিচ্ছেন এবং তাঁর ডায়াবেটিস একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত।
চট্টগ্রামের যে অংশটাতে আমরা থাকতাম, সেটাকে পুরান ঢাকার মতন পুরান চট্টগ্রামের অংশ বলা যেতে পারে, যদিও কেউ সেখানে পুরান চট্টগ্রাম বলে না। বিভাগীয় শহর হলেও আমাদের চারপাশে বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল আমাদের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের; এর সাথে অন্য বাড়িগুলো ছিল খুব কাছঘেঁষা। আম্মা বিকেল বেলায় প্রতিবেশী মহিলাদের সাথে গল্প করতেন আর আমার বাসায় ফেরার অপেক্ষা করতেন। আমার এখনো মনে আছে মাগরিবের আগে আম্মা আমার টিউশনি শেষ করে ফেরার জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। মোবাইলবিহীন সেই যুগে সন্তান কখন ফিরবে, সেটা আঁচ করে অপেক্ষা করা তখনকার সব মায়েদের বৈশিষ্ট্য ছিল কি না জানি না, কিন্তু আম্মার সেটা ছিল—সেটা আমি নিশ্চিত। আমি গলির মুখে ঢুকতেই যখন দেখতাম উনি দাঁড়িয়ে আছেন, তখন খুব ভালো লাগত। কিন্তু এই দারুণ মুহূর্তগুলোতে ছেদ পড়ল যখন ২০০১-এর শুরুর দিকে আম্মার অসুস্থতা খুব খারাপ দিকে মোড় নিল। একদিন তিনি খুব অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ শুরু করলেন; অস্থির হয়ে যেন দুই-তিন বছরের শিশু হয়ে গিয়েছিলেন। আব্বা অফিস থেকে ফেরার পর তাঁকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটলাম।এমন অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য ছিল খুবই নতুন - আমাদের এই জ্ঞানটুকুও ছিল না যে এমন রোগীকে সরাসরি ‘জরুরি বিভাগে’ নিয়ে যেতে হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁর ডায়াবেটিস দীর্ঘকাল ধরে অনিয়ন্ত্রিত। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পরে আমরা বাসার পিছনের বাগানে, একটা জানালার ধারে, ছুড়ে ফেলে দেওয়া অনেক ডায়াবেটিসের ওষুধ খুঁজে পেয়েছিলাম; এলাকার কোনো এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের পরামর্শ লোকমুখে শুনে তিনি ওষুধ না খেয়ে ফেলে দিতেন এবং আমরা কেউই সেটা জানতাম না।
ডাক্তারের কথামতো তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরপরই তিনি কোমায় চলে যান। সাত দিন পর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, দেখা গেল তাঁর এক পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং তিনি পুরোপুরি শিশুর মতো আচরণ করছেন। সবার নাম ঠিকমতো বলতে পারতেন না আর হাঁটাচলা তো একেবারেই বন্ধ। ধীরে ধীরে আমরা আম্মাকে এমন অবস্থায় দেখতে অভ্যস্ত হতে শুরু করি। এই পরিস্থিতি চলেছিল এক বছরেরও বেশি সময়। এক পর্যায়ে তিনি মুখ দিয়ে খেতে চাইতেন না বলে নাক দিয়ে খাবার দেওয়ার নল (Feeding tube) স্থায়ী হয়ে গেল।
এক সময় আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে ঢাকা চলে আসতে হলো। বিদায় নেওয়ার দিনটির কথা আমার এখনো খেয়াল আছে। হঠাৎ সেই ছোট্ট ২-৩ বছরের মেয়ের মতো আচরণ করা আম্মা মুহূর্তের জন্য যেন আগের আম্মা হয়ে গেলেন। আমি যখন বললাম, “আম্মা, আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি,” তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “এটা কোনো কথা হলো?” তারপর কাছে ডেকে গালে হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপর হঠাৎ করে আমাকে কামড়ে দিলেন; যেন তাঁর ভেতরের ছোট্ট শিশুটি আমার চলে যাওয়ার কথা শুনে রাগ আর দমিয়ে রাখতে পারেনি।
তখনো মোবাইল খুব বেশি সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি, ল্যান্ডফোন তখনো যোগাযোগের প্রাথমিক মাধ্যম। ঢাকায় আসার পর আমি বকশীবাজারের টেলিফোন দোকানগুলোতে ২০ টাকা দিয়ে ৫ মিনিট কথা বলতাম চট্টগ্রামের বাসার সবার সাথে। ওই দোকানগুলোতে অনেক হৈচৈ থাকতো; এর মধ্যেও আমি ফোনে আম্মাকে বলতাম, “আম্মা, আমি আপনার আরিফ।” কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দিতেন না; হয়তো চিনতেই পারতেন না, অথবা প্রচণ্ড অভিমান থেকে কথা বলতেন না—আমি আর কখনোই তা জানতে পারিনি। আমার অনুপস্থিতিতে আব্বা আর ভাইয়া বেশ কষ্টে পড়ে গিয়েছিলেন। ঘর সামলানোর মতো কোনো নারী সদস্য না থাকায় নার্স রাখাটাও বেশ ঝক্কির ছিল। এমন প্রতিকূল পরিবেশে কোন এক সময় ২০০২ সাল এলো। প্রথম সেমিস্টার শেষে আমি যখন চট্টগ্রাম ফিরলাম, তার কিছুদিনের মধ্যেই আম্মা মারা যান।
এই দীর্ঘ এক বছরের অসুস্থতার বর্ণনা কেবল এই এক অনুচ্ছেদে শেষ হওয়ার মতো নয়—এখানে অনেক অনুগল্প ছিল। কখনো আম্মার শিশুসুলভ আচরণে আমরা হাসতাম, যেন মাকে শিশু হিসেবে রাখতে পারলেও আমাদের অনেক ভালো লাগবে, তারপরও বেঁচে থাকুক; কখনো ডাক্তারের কাছে গিয়ে আমাদের তিন ভাই-বোনের বকা খাওয়া - কখনো নার্সদের চলে যাওয়ার ভয়, কখনো অন্যদের কাছে আম্মার শরীরের ক্রম অবনতি কে লুকানো যেন সেবা না কমে যায় - এমন অনেক গল্প। একটা গল্প না বললেই নয় - আম্মা মারা যাওয়ার শেষ সপ্তাহে তাঁর স্বাস্থ্য যখন দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, তখন একবার টিউব দিয়ে খাবার দেওয়ার সাথে সাথে সেটা তিনি বমি করে দিলেন, আর নার্সদের একজন (দুজন নার্স রাখতাম) ভয় পেয়ে টিউবটি খুলে ফেলে। এরপর আমরা পড়লাম এক ভয়াবহ সিদ্ধান্তের পরীক্ষায়: ফিডিং টিউব নতুন করে লাগাতে নার্স ভয় পাচ্ছে, আবার টিউব না লাগালে তিনি খাবার বা ওষুধ পাবেন না। শেষ পর্যন্ত একজন নার্স টিউব লাগাতে রাজি হলো আর আমি মায়ের মাথা শক্ত করে ধরে রাখলাম যেন তিনি বাধা দিতে না পারেন। তখন আশেপাশের আত্মীয়রা আমাকে ‘পাষাণ’ ভাবছিলেন, অথচ তখন আমি ভিতরে কেঁদেই যাচ্ছি; দায়িত্ব নেওয়ার পর তো আর সবার সামনে কান্না করা যায় না। আম্মা তখন স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন; এরপর আর কখনো চোখে চোখ রাখা হয়নি। এর দিন কয়েকের মধ্যেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন, রহম করেন আর তাঁর কবরকে প্রশস্ত করেন।
এই লেখাটি কেবল স্মৃতিচারণ নয়; বরং পরিবারের কারো ক্রনিক অসুস্থতায় আমাদের দায়িত্ব ও সচেতনতা নিয়ে ভাববার জন্য কিছু নাসীহাহ। ২০০০ সালের দিকে আজকের মতো এত রেস্টুরেন্ট ছিল না। পোলাও-বিরিয়ানি কেবল বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানেই পাওয়া যেত। আর মিষ্টি খেতে পাওয়া যেত কেবল সেদিন, যেদিন কোনো মেহমান মিষ্টি নিয়ে বেড়াতে আসতেন। আমি প্রায় ৮-৯ বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের সাথে বিয়ে বাড়িতে মেয়েদের মধ্যে খেতে বসতাম; আমার খুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মা তাঁর ‘সোনার পুতলাকে’ (আমাকে ডাকা অনেকগুলো নামগুলোর একটা) তাঁর পাতের মুরগির রোস্টটাও যেন খাওয়ানো যায়, সেই জন্য আমাকে নিয়ে বসতেন। আমাদের বাসায় তখন সপ্তাহে একদিন শুক্রবার পোলাও রান্না হতো। এছাড়া যেদিন আপা আর দুলাভাই আসতেন, সেটা যদি শুক্রবার না হতো, তাহলে আমাদের পোয়াবারো; আরও একবার পোলাও খেতে পারতাম। আম্মা নিজে কোক খেতে পছন্দ করতেন এবং বাসায় সবসময় সফট ড্রিংকসের স্টক থাকতো মেয়েজামাইয়ের জন্য। এই সীমাহীন খাদ্য উৎসবে আমরা কখনো ভাবিনি , একজন ডায়াবেটিক রোগীর নিয়মিত এমন রিচ ফুড আর সফট ড্রিংকস খাওয়া কতটা বিপজ্জনক।
আজ প্রায় ২৫ বছর পর রেস্টুরেন্ট কালচার, স্ট্রিট ফুড আর মাদের কর্মব্যস্ততার চাপে বাইরে খাওয়াটা যখন নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তখন দেখা যাচ্ছে তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ পরিবারগুলোতেই ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত সদস্যদের প্রতি উদাসীনতা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে; অন্য পরিবারগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। এছাড়া আমাদের দ্বীনি কমিউনিটিগুলোতেও সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর অজুহাতে এমন সব অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস জেঁকে বসেছে যে, সেটি নিশ্চিতভাবেই বড় ধরণের সংশোধনের দাবি রাখে।নিচে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) শেষ যুগের মুসলিমদের অপছন্দনীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হিসেবে যে স্থূলতা নিয়ে সাবধান করেছেন, সে বিষয়ে অনেকেই জানেন না।
অনেকে আমাকে ভুল বোঝেন এবং মেহমানদারির বিরোধী মনে করেন; আসলে ব্যাপারটা তা নয়; বরং দাওয়াতে অতি আয়োজন থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে অপচয় রোধ করা আর অসুস্থ ব্যক্তিকে জোর করে তাঁর জন্য ক্ষতিকর খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত রাখাটাই আমার মূল কথা। একবার একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির বড় ছেলে আমাকে জানাল যে, তাঁর বাবাকে একজন দ্বীনি ভাই দাওয়াত করে নিয়ে গিয়ে জোর করে এমন সব জিনিস খাইয়েছেন যাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। যিনি মেজবান ছিলেন তাঁর বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন— “আরে শায়খ, খান, কিচ্ছু হবে না; আমারও তো কিডনির সমস্যা!” দুঃখের ব্যাপার হলো, ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম জোরজবরদস্তি চলে। যেহেতু এর প্রভাব সহসাই চোখে পড়ে না, তাই এটা চলতেই থাকে—অথচ elevated সুগার লেভেল নিয়ে দিনের পর দিন চলতে থাকা শরীরের অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে ভেতর থেকে বিকল হতে থাকে। ইমরান বিন হুস্বাইন (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হল আমার সাহাবীদের যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ীদের) যুগ। ইমরান বলেন, ’নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর যুগের পর উত্তম যুগ হিসাবে দুই যুগ উল্লেখ করেছেন, না তিন যুগ তা আমার জানা (স্মরণ) নেই।’ ’’অতঃপর তোমাদের পর এমন এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদেরকে সাক্ষী মানা হবে না। তারা খেয়ানত করবে এবং তাদের নিকট আমানত রাখা যাবে না। তারা আল্লাহর নামে মানত করবে কিন্তু তা পুরা করবে না। আর তাদের দেহে (ভাল ভাল খাদ্য খেয়ে) স্থূলত্ব প্রকাশ পাবে। (বুখারী ২৬৫১, মুসলিম ৬৬৩৮)
সুস্থতা একটি নিয়ামত এবং এটি রক্ষায় আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সকাল-সন্ধ্যার দুআয় যে কয়টি বিষয় থেকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন, তার মধ্যে ‘বার্ধক্যের অকর্মণ্যতা’ অন্যতম। আর এটি এড়ানোর জন্যই আমাদের খাদ্যাভ্যাস ঠিক করতে এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করতে সচেষ্ট হতে হবে। আমি অনেক সময় এমন প্রশ্ন শুনেছি যে, ব্যায়াম করা নিয়ে এই হৈচৈ নাকি সুন্নাহবিরোধী; কিন্তু প্রশ্নকারীরা ভুলে যান যে, রাসূল (সা.) এবং সাহাবীরা সেই সময়ে প্রচুর কায়িক শ্রম করতেন এবং তাঁদের কাছে খাবার কখনোই বিনোদনের উপলক্ষ ছিল না। অথচ আমরা এখন ৭০০-৮০০ মিটার পথও রিকশায় পাড়ি দিই, আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারেও দেখা যায় প্রচুর জাঙ্ক ফুড খাওয়া হচ্ছে—কেননা স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো দিন দিন দামী আর দুর্লভ হয়ে উঠছে। তাই নিজেকে কর্মঠ রাখতে কায়িক শ্রম জারি রাখা এবং নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ও খেলাধুলা করার বিকল্প নেই। এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস পরিবর্তন করা প্রয়োজন, সেটি হলো—যেকোনো ছোট উপলক্ষ ঘিরেই প্রচুর অস্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করা। লেখার শুরুতে বলছিলাম, বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া ৯০-এর দশকে পোলাও-বিরিয়ানি খাওয়া ছিল খুবই বিরল; অথচ এখন কোনো দাওয়াত ছাড়াও অফিস-আদালতে লোকজন মাসে অন্তত চারবার পোলাও, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি জাতীয় ভারি খাবার খায়। আর পরিবারের মধ্যে যাদের বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন—যেমন বয়স্ক বাবা-মা—তাঁদের খাওয়া-দাওয়া আর অন্যান্য কার্যক্রম দেখাশোনা করার দায়িত্ব পরিবারের কাউকে না কাউকে নিতে হবে।
প্রায়ই দেখা যায়, পার্কগুলোতে অনেক বয়স্ক ভদ্রলোক বা মহিলা তাঁদের হাঁটার সঙ্গীদের সাথে যৎসামান্য হেঁটে সরাসরি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভুরিভোজ করে আসছেন (যেহেতু বাসায় অনেক খাবারে নিষেধাজ্ঞা আছে)। পরবর্তীতে ডাক্তার যখন চ্যালেঞ্জ করছেন, তখন তাঁরা বলছেন, “আমি তো নিয়মিত সকালে হাঁটাহাঁটি করি।” এই প্রবণতা যুবক এবং প্রৌঢ়দের মধ্যেও আছে; তাঁরা যখন নিয়মিত হাঁটেন বা ব্যায়াম করেন, তখন যতটুকু ক্যালরি খরচ করেন, মনে করেন তার চেয়ে চারগুণ বেশি খরচ করে ফেলেছেন; ফলে তাঁরা আগের চেয়ে উল্টো খাওয়া বাড়িয়ে দেন। ফলাফল হলো—ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন; “ডাক্তার সাহেব, এইসব ব্যায়াম-ফ্যায়াম করে কোনো লাভ নেই, আমি গত তিন মাস ধরে করছি, অথচ ওজন কমার বদলে উল্টো বাড়ছে।” এরপর আবার সেই পুরনো অস্বাস্থ্যকর রুটিনে ফেরত যাওয়া।
আমার মনে হয়েছে, ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ে খাবারের উপাদান—শর্করা, আমিষ, চর্বি, মিনারেলস, ভিটামিন—এসব শেখানো হলেও এগুলোর কোনটা কার কতটুকু দরকার, সেই বুঝ আমরা রাখি না। এটাও আমাদের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আরেকটি বড় কারণ। কিন্তু আমার মা মারা যাওয়ার পর আমি খুব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, নিজের পরিবারে আমি স্বাস্থ্যসচেতন হবো। পরে দ্বীনের পথে এসে দেখেছি এটি ইসলামের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। একবার এক খুতবায় শুনেছিলাম, মুসলিমদের অধঃপতনের অন্যতম কারণ তারা মস্তিষ্ক এবং ক্বলবকে (হৃদয়) বাদ দিয়ে জিহ্বা এবং যৌনাঙ্গের চাহিদা মেটানোকেই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য করে ফেলেছে - আজকের পৃথিবীর বাস্তবতায় এটা খুব ভুল বিশ্লেষণ বলে মনে হয়না। তাই, বার্ধক্যের অকর্মণ্যতা ও স্থূলতা থেকে পরিত্রাণের জন্য এবং পরিবারের কাউকে দীর্ঘকালীন অসুস্থতার হাত থেকে বাঁচাতে আমরা নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারি।
- খাবার গ্রহণকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করার যে চল আমাদের মধ্যে চালু রয়েছে, সেটা থেকে বের হয়ে আসা চাই। মেহমানদারি অবশ্যই থাকবে, তবে তা যেন মাত্রাতিরিক্ত আয়োজন ও অপচয়মুক্ত হয়।
- নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্থূলতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের পুষ্টিগুণ বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করা উচিত। পরিবারের কাওয়ামদের উচিত নিজে এই ব্যাপারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এবং পরিবারের নারী সদস্যদের এই বিষয়ে সাহায্য করা; সেটা নিয়মিত হাঁটার ব্যবস্থা করে হতে পারে অথবা স্বাস্থ্যকর খাওয়ার ব্যাপারে পারিবারিক অভ্যাস তৈরি করে।
- হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সদস্যদের দেখভালের জন্য পরিবারের একজনকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিতে হবে।
- চিনি এবং ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার ‘নেশা’ ত্যাগ করে এগুলোকে মাসে একবার বা দুইবারে নামিয়ে আনতে হবে।
- মেহমানদারির সময় কেউ কোনো খাবার এড়িয়ে যেতে চাইলে জোর করবেন না, বরং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
- স্ক্রিন টাইম কমিয়ে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা খেলাধুলার সময় বের করতে সচেষ্ট হতে হবে।
মনে রাখবেন—স্থূলতা থেকে আসে অলসতা, অলসতা থেকে ইবাদতে (বিশেষ করে নফল ইবাদতে) অনাগ্রহ, আর এর সূত্র ধরেই শুরু হয় ঈমানের অবনমন। পরিবারের কোনো একজন সদস্য যখন দীর্ঘকালীন বা জটিল কোনো অসুস্থতায় ভোগেন, তখন পরিবারের সবাইকে আর্থিক, শারীরিক এবং মানসিকভাবে তার মাশুল দিতে হয়। তাই আল্লাহর কাছে নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার আজকারের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে আশ্রয় চাওয়ার পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোকে সুস্থ এবং কর্মক্ষম রাখুন, যাতে ইবাদতের পাশাপাশি আমরা দুনিয়ার কাজগুলোও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।
২৩ শে রজব ১৪৪৭ হিজরী