দাম্পত্যে দূরত্ব: যখন সন্তানরাই হয়ে ওঠে ‘দেয়াল’
পারিবারিক সমস্যা নিয়ে দম্পতিদের কাউন্সেলিং করতে গিয়ে আমি আধুনিক মুসলিম পরিবারগুলোর ভেতরে কিছু বিশেষ প্রবণতা বা ‘ট্রেন্ড’ খেয়াল করেছি। বাবা-মা হয়ে গেছেন এমন দম্পতিদের সম্পর্কের অবনতির ক্ষেত্রে একটা বিষয় খুব প্রকট। যখন তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয়—আপনাদের নিজেদের মধ্যে কি পরিমান অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর সুযোগ পান ? বেশির ভাগ দম্পতির উত্তর হয়—সেটা নেই বললেই চলে। এখানেই আসল সমস্যাটা শুরু হয়। কাজ শেষে ঘরে ফেরার পর স্বামীরা যখন স্ত্রীর কাছ থেকে কেবল সারা দিনের অভিযোগের ফিরিস্তি শুনতে থাকেন, তখন এক সময় ঘরে ফেরাটাকেই তারা ঘৃণা করতে শুরু করেন। অন্য দিকে, “সারা দিন ঘরেই তো থাকো, এমন কী আর কর?”—স্বামীদের এমন প্রশ্নবানে জর্জরিত স্ত্রীরাও স্বামীর ফেরাকে আর আকাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয় মনে করেন না।
ধরা যাক, এই প্রতিকূলতার ভেতরেও দু’জন কিছুটা সময় এক হতে চাইলেন; কিন্তু দেখা যায় তাঁদের রুমে সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যরা নক না করেই যখন-তখন ঢুকে পড়ছে। ফলে এক সময় এই দম্পতিও ধরে নেন যে, তাঁদের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত আসলে অস্তিত্বহীন একটি ধারণা মাত্র, যা সন্তান হওয়ার পরেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া সন্তানরা বড় হওয়া সত্ত্বেও তাদের বাবা-মায়ের বিছানায় বা একই রুমে রাতে থাকার অভ্যাসও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এতে করে স্বামী-স্ত্রী তাঁদের একান্ত সময়টুকু কাটাতে পারেন না এবং একে অপরের জন্য মানসিক প্রশান্তির কারণ হয়ে উঠতে ব্যর্থ হন।
আমাদের এই জনপদের মুসলিমদের ওপর (সুফিবাদের প্রভাবে) এক ধরনের ভুল ধারণা জেঁকে বসেছে যে, সংসার জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা মেটানো বোধ হয় তাকওয়ার পরিপন্থী। এমনকি অনেক পরিবারে দেখা যায়, স্বামীদের বাবা-মারাও (যদি একসাথে থাকেন) এটা পছন্দ করেন না যে তাদের ছেলে কাজ থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর সাথে কিছুক্ষণ একান্তে কথা বলুক। এটাকে তাঁরা ‘আধিক্ষেতা’ বা অস্বাভাবিক আচরণ মনে করেন। অথচ আরব দেশগুলোর দ্বীনদার পরিবারগুলোতে দেখা যায়, হাফ ডজন বাচ্চা থাকলেও বাবা বাসায় ফিরলে বড় সন্তানটি ছোটদের নিয়ে অন্য রুমে চলে যায়। সে তার ভাই-বোনদের বোঝায় যে, এখন বাবা-মা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলবেন এবং সেখানে কারো থাকা ঠিক নয়।
আমাদের সমাজে এগুলো অকল্পনীয়। কারণ আমরা বাহ্যত দ্বীনদার হলেও দাম্পত্য এবং পারিবারিক জীবনের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাগুলো হয় জানি না, অথবা জানলেও মনে করি এগুলো কেবল বিয়ের প্রথম বছরের জন্য প্রযোজ্য। চলুন এই বিষয়ক কিছু হাদীস দেখে নেওয়া যাক:
১. জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কারো যদি কোন স্ত্রীলোক দেখে মনে কিছু উদয় হয় তখন সে যেন তার স্ত্রীর নিকট আসে এবং তার সাথে মিলিত হয় । এতে তার মনে যা আছে তা দূর হবে। (সহীহ মুসলিম : ১৪০৩)
২. আলকামা (রহঃ) বলেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ (রাঃ)-র নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি আমার মায়ের নিকট (প্রবেশ করতেও) অনুমতি চাইবো? তিনি বলেন, নিশ্চয় অপ্রস্তুত মুহুর্তে তুমি তাকে দেখতে পছন্দ করবে না। (আদাবুল মুফরাদ: ১০৬৯)
৩. আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে সালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে তখন (সালাত আদায় না করলে) এজন্য তাদেরকে মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দিবে। (আবু দাউদ: হাসান সহীহ, ৪৯৫)
এই হাদিসগুলো থেকে ইসলামের দেওয়া কিছু গুরত্বপূর্ণ শিক্ষা আমরা উপলব্ধি করতে পারি: বাসায় ফেরার পর স্ত্রীর একান্ত সান্নিধ্য স্বামীর অধিকার এবং চাহিদা হতে পারে। ইসলাম এটাকে কেবল স্বীকৃতিই দেয় না, বরং তা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেয়।
- বাবা-মায়ের রুমে সন্তানদের অবাধ বিচরণ কাম্য নয়। সন্তানদের এই আদব বা শিষ্টাচার শেখাতে হবে।
- দশ বছর বয়স হওয়ার পর কোনোভাবেই সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের সাথে একই বিছানায় থাকতে পারবে না।
দাম্পত্য সম্পর্কের মান নিয়ন্ত্রণ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার নিয়মিত অন্তরঙ্গতা। কিন্তু আমাদের নারীদের এ বিষয়ে যথেষ্ট পারিবারিক শিক্ষা দেওয়া হয় না। উল্টো অনেক সময় এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। যেমন—সন্তান গর্ভে আসার পর স্ত্রীর বাবার বাড়ি চলে যাওয়া এবং সন্তান হওয়ার অনেক পরে ফেরত আসা; আর এই লম্বা সময়ে স্বামী যদি স্ত্রীর খোঁজ নিতে বেশি আগ্রহী হয়, তবে সেটাকে তাচ্ছিল্য করা হয়। এই লিখার ফোকাস অবশ্য বৈবাহিক জীবনের সন্তান হবার পরের অংশ নিয়ে।
কাউন্সেলিংয়ে আসা অনেক দম্পতি জানান, মাস পার হয়ে গেলেও তাঁরা একান্তে কথা বলার সুযোগ পান না - আর ঘনিষ্টতা তো দূরের আলাপ। এদের একটা বিশাল অংশ বলেন যে তাদের সাথে বেডরুমে তাদের একাধিক সন্তান থাকছে এবং তারা যেকোন সময় রুমে আসা যাওয়া করে বিধায় স্বামী চাইলেও স্ত্রী কাছে আসার সাহস পান না অথবা রুচি হয়না। দেখা যায়, সন্তানের বয়স ৭ থেকে ১৫ বছর হওয়ার পরেও বাবা-মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমাচ্ছে। এমন নয় যে বাসায় অতিরিক্ত রুম নেই; বরং সন্তান একা থাকতে ভয় পায় কিংবা অভিভাবকরা মনে করেন বাচ্চাদের তাড়াতাড়ি আলাদা করা ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতি’—এমন ভুল ধারণাই এই সমস্যার মূল।
স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তাঁদের মানসম্পন্ন একান্ত সময় নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে নিজেদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে যেন ঘরের সন্তানরাও বাবা-মায়ের ব্যাপারে ইসলামী আদব মেনে চলে। আমরা নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারি:
- মুরুব্বিদের ভূমিকা: ঘরের মুরুব্বিদের উচিত বাড়ির কর্তা যখন বাড়ি ফেরেন, তখন তার জন্য স্ত্রীর সান্নিধ্যে আসার প্রক্রিয়াকে সহজ করে দেওয়া। নাতি-নাতনিদের আদর করে নিজের কাছে রাখা বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রেখে তাদের এই সুযোগটা করে দেওয়া যায়। পুত্রবধূর প্রশংসা করে এই চর্চাকে উৎসাহিত করা মুরুব্বিদের বড় মনের পরিচয়।
- সন্তানদের শিক্ষা প্রদান: ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে যে, বাবা-মায়ের কিছু একান্ত সময় থাকে যেখানে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। অনুমতি ছাড়া বাবা-মায়ের রুমে ঢোকা যে নিষেধ, সেই শিষ্টাচার তাদের মজ্জাগত করাতে হবে।এই ব্যাপারে আপনার বড় সন্তানটি অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে পারে।
- বিছানা আলাদা করা: সঠিক বয়সে বাচ্চাদের বিছানা আলাদা করে দিতে হবে। আপনার বড় সন্তান যদি অন্য রুমে থাকে, তবে কনিষ্ঠ সন্তানকে তার ভাই-বোনদের সাথে শিফট করে দিন। এতে তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা বাড়ে। স্নেহ মানেই সারাক্ষণ একই বিছানায় থাকা নয়; বরং নির্দিষ্ট বয়সের পর এটি নিষিদ্ধ। অনেক দাদা-দাদি বা নানা-নানি এটাকে ‘ওয়েস্টার্ন কালচার’ বলে ভুল ধরেন, যা মূলত জ্ঞানের অভাব। এছাড়া এই ধরণের সেটআপ সন্তানদের বড় ধরনের মানসিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে কেননা তারা যেকোন অসতর্ক মুহূর্তে নিজের বাবা মাকে এমন পরিস্থিতিতে দেখতে পারে যেটা তার জন্য খুবই ঘৃণিত এবং স্থায়ী ।
আল্লাহ আমাদের মুসলিম পরিবারের দাম্পত্য সম্পর্কগুলোকে প্রশান্তির উৎস বানিয়ে দিন।
আবু আঈশা ১৫ রজব ১৪৪৭